মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

হাতির ঝিল

স্বপ্নের প্রকল্প হাতির ঝিল

 

 ২০০৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) শেষ বৈঠকে বহুল আলোচিত বেগুনবাড়ী-হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এক হাজার ৯৬০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যা প্রতিরোধ, ময়লা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাজধানীর যানজট নিরসন এবং নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।

 

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে মাত্র কয়েক মিনিটেই এর গা ঘেষে রাস্তা দিয়ে রামপুরা থেকে কারওয়ান বাজার বা কারওয়ান বাজার থেকে অল্প সময়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে গুলশান হয়ে বাড্ডা। এতে করে তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, মৌচাক ও মগবাজারের অসহনীয় যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।

 

পরিবেশ ও নান্দনিকতার দিক থেকে হাতিরঝিল ঢাকায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। হাতিরঝিলের সাথে ক্রমান্বয়ে গুলশান ও বনানী লেকের সংযোগ দেওয়া হবে। সারা বছর ঝিলের পানি স্বচ্ছ রাখার ব্যবস্থা থাকবে। ঝিলের চারদিকে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, ওভারপাসসহ ঝিলের দুপাশে পূর্ব-পশ্চিমে সড়ক নির্মাণ করা, লেকের এপার থেকে ওপারে যাওয়ার জন্য দৃষ্টিনন্দন সেতু, নজরকাড়া বাহারি ফোয়ারা, চমৎকার শ্বেতশুভ্র সিঁড়ি নির্মাণ শেষ পর্যায়ে। এছাড়া বিনোদনের জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, শিশুপার্ক, বিশ্বমানের থিয়েটার, শরীর চর্চা কেন্দ্র, পর্যটকদের নামাজ আদায়ের জন্য থাকবে মসজিদ। পালতোলা নৌকায় নৌবিহার করার সুবিধাও রয়েছে এখানে।

 

যেখানে বছর কয়েক আগেও হাতিরঝিল ছিল পঁচা পানির আধার। কিন্তু বর্তমানে এটি ঝকঝকে পানি ধারণ করছে। পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হবে এই ঝিলে। ময়লা পানি নিষ্কাশনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। থাকবে ঝিল ঘেঁষা রাস্তার পাশে বৃক্ষরাজি আর ফুলের সমারোহ।

 

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ৩০২ দশমিক ৮৭২৩ একর ভূমির উপর  ৪টি ব্রিজ, ৪টি ওভারপাস, ৩টি ভায়াডাক্টের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। সম্পন্ন হয়েছে শতভাগ ভূমি খনন কাজ। রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে ৯৮ ভাগ। ব্রিজ নির্মাণের কাজ হয়েছে ৯৯ ভাগ। ওভারপাসের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৯৮ ভাগ। ফুটপাত ৮৫ ভাগ। ওয়াকওয়ে ৬০ ভাগ। মেইন ডাইভারশন স্যুয়ারেজ ৯৮ ভাগ। লোকাল ডাইভারশন স্যুয়ারেজ ৯৫ ভাগ। বিশেষ ডাইভারশন কাঠামো ৯০ ভাগ। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। হাতিরঝিল প্রকল্পের আবর্জনার পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১০ কোটি ৫৫ লাখ সিএফটি। এ পর্যন্ত পরিষ্কার করা হয়েছে ৮ কোটি ৮৫ লাখ সিএফটি। তবে লেকের মাঝখানে এখনো ২টি মসজিদ, ১টি মাদ্রাসা ও বহুল আলোচিত বিজিএমই ভবনটি এখনো রয়েছে। এর বাইরে প্রগতি স্বরণী রামপুরা মোড় ও প্রগতি স্বরণী বাড্ডায় দুটি ফ্লাই ওভার তৈরির কাজ এখনো শুরু হয়নি। এ দুটি তৈরির আগে উদ্বোধন রামপুরা ও বাড্ডা এলাকায় তীর্ব জানজট হতে পারে বলে এলাকাবাসীদের আশঙ্কা।

 

হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী এলাকার পরিবেশ দূষণরোধ, জলাবদ্ধতা নিরসন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত উন্নয়নসহ বেশ কিছু উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০৭ সালে শুরু হয় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন বরাদ্দ ধরা হয় ১ হাজার ৪৮০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। যা ২০১০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। পরবর্তী সময়ে এর ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। একই সাথে সময় বৃদ্ধি করা হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। এই প্রকল্পের জন্য ৩০২ দশমিক ৮৭২৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়।

 

প্রকল্পের অধিকাংশ জমিই ব্যক্তি মালিকাধীন হওয়ায় ভূমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এই ৭৬টি মামলার সূত্রপাত হয় যার অধিকাংশ নিস্পত্তি হয়ে গেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাতিরঝিল প্রকল্পে যে ৭৬টি মামলা হয়েছে তার সবগুলোরই বাদী স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত অধিবাসী ও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বেশিরভাগ মামলা হয়েছে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বাজার মূল্যের চেয়ে কমদামে সরকার ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রায় সব অবকাঠামোও ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।

 

হাতিরঝিল প্রকল্পের কাজ সম্পাদনের জন্য বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে রাজউককে ১ হাজার ১১৩ কোটি ৭ লাখ টাকা, এলজিইডিকে ২৭৬ কোটি টাকা, ঢাকা ওয়াসাকে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

 

প্রকল্প সমীক্ষায় জড়িত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে ১ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনকে (এসডব্লিউও) ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ১৫০ কোটি টাকা জাপানের ঋণ মওকুফ অনুদানের। বাকি টাকা অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার।

 

১ জানুয়ারি ২০১৩ সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিক ভাবে এ প্রকল্প উদ্বোধন করেন।

 

উল্লেখ্য, হাতিরঝিল প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অরগানাইজেশনের পশ্চিম বিভাগের কর্মকর্তা ও সৈনিকরা মাঠ পর্যায়ে সামগ্রিকভাবে কাজের বাস্তবায়ন করছেন। রাজউক লিড অরগানাইজেশন হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

 

সূত্রঃ টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪.কম/এমএ রহমান/এন/শুভ/ক/মাহতাব/১জানুয়ারি২০১৩